দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আস্থা ও সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের শাসনকালে তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথমে একটি সংশোধনী বলি, গ্রেফতার আতঙ্ক– আমার কাছে কোনো আতঙ্ক ছিল না।’ তখনকার বিচার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আইন-কানুনের অভাব ছিল এবং পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চিত, তবে তিনি কখনো ভয় পাননি। তারমতে— ‘যেহেতু দেশে আইন-কানুন ছিল না, তাই যেকোনো কিছু হতে পারে, তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
অধ্যাপক ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা যখন বিচারাধীন, তখন হঠাৎই পাল্টে যায় দেশের প্রেক্ষাপট। ছাত্র-জনতার টানা ৩৬ দিনের অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরপর, অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বেই গঠন করা হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকার গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো চিন্তা ছিল না, যে আমি হঠাৎ করে একটি সরকারের প্রধান হবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে তখন এমন এক পরিস্থিতি ছিল, যেখানে সব কিছু তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তাই আমার প্রথম কাজ ছিল সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করা।’
একটা পলাতক দল (আওয়ামী লীগ) দেশ ছেড়ে চলে গেছে, তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। এখন তারা দেশটাকে অস্থিতিশীল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা জানালেন, দেশের উন্নতির জন্য সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, ‘১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার পরিচালনা করেছে এবং তিনটি নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু ভোটারদের আস্থা পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি, ব্যর্থতা, এবং প্রশাসনিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল।’ সুতরাং, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। তারমতে—‘সংস্কার ছাড়া আমরা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারব না।’
বর্তমান সরকারের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক আস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ধ্বংসাবশেষ থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।’ তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের জন্য আস্থা তৈরি হয়েছে, যা সরকারের সফলতার একটি বড় প্রমাণ। ‘বিশ্বের সব দেশ আমাদের সহায়তা করতে চাচ্ছে, যা আমাদের উন্নতির প্রমাণ,’ তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা জনগণের আস্থা নিয়ে বলেন, ‘আমার মনে হয়, দেশের জনগণের আস্থা আমাদের উপর আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে আমরা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য। যদিও কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে, তবুও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা হারানো হয়নি, যদিও কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কাজ কিছুটা সময় নিয়েছে। তবে, আমরা আশাবাদী যে ভবিষ্যতে এসব সমস্যার সমাধান হবে।’
সম্প্রতি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই অনেককাংশে বেড়ে গিয়েছে। চাঁদাবাজি চলছে, দিনে-দুপুরে। এমন পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, একটা পলাতক দল (আওয়ামী লীগ) দেশ ছেড়ে চলে গেছে, তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। এখন তারা দেশটাকে অস্থিতিশীল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিকের স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে পুলিশ বাহিনী ভয়ে রাস্তায় নামতে পারছিল না।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর মানসিকতা ঠিক করার জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক উন্নত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি, তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ নতুন উদ্যোগ হিসেবে তিনি জানান, ‘বর্তমানে মামলার প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য অনলাইনে রিপোর্ট দাখিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে জনগণ কোনো হয়রানির শিকার না হয়।’
প্রধান উপদেষ্টা বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর কোনো সম্পর্কের ফাটল হয়নি।’ তিনি আরও জানান, ‘রাজনৈতিক পরিবেশে মতভেদ থাকলেও, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের উন্নয়ন।’ তিনি বলেন, ‘সরকার দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে চায়, এবং সবাই একত্রিত হলে আমরা সেটা সফলভাবে করতে পারবো।’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে।’ তবে মাঝে মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, ‘যা আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথম সপ্তাহেই আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, বিশেষ করে স্টারলিংক কানেকশনের বিষয়ে, যা বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
প্রধান উপদেষ্টা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা সম্পর্কে জানান, ‘সেনাবাহিনী সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করছে।’ তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে সকল রাজনৈতিক দলের একমত হওয়া প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘যেসব সুপারিশে সব দল একমত হবে, সেগুলো নির্বাচন পর্যন্ত কার্যকর হবে, এবং বাকিগুলো নির্বাচনের পরে কার্যকর হবে।’
রাজনীতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না, এবং ভবিষ্যতেও করব না।’ তিনি স্পষ্ট করে জানান, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলাম না, তবে দেশের স্বার্থে আমাকে সরকারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই, এবং ভবিষ্যতেও রাজনীতিতে যাব না।’