সকলের প্রচেষ্ঠায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ইউপি নির্বাচন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রসংশনীয়

97

গত ২৮ নভেম্বর হয়ে গেল শেরপুরের নকলায় তৃতীয় ধাপের ৯টি ইউনিয়ন পরষিদ নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে থাকে দেশের বহু উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ। বিশেষ করে দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল। অবশ্য এ জায়গাগুলো সব নির্বাচনের সময়ই অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশি উত্তপ্ত থাকে। এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ যা হয়েছে, তা বিগত ২০১৫ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা বিগত নির্বাচন থেকে নিম্নগামী, যা ভোটারদের শঙ্কিত করে তুলেছিল।

দেশের বিভন্ন যায়গাতে গাড়ি পোড়ানো ও নির্বাচনী কেন্দ্র ভাংচুর, দোকান ভাংচুরের মহা উৎসব ঘটনা ঘটলেও শেরপুরের নকলার চিত্র পুরো ভিন্ন। প্রশাসন বলেছিল এবারের নির্বাচন হবে ভিন্ন। আসবে নতুনত্ব ও উৎসব মুখর। ভোটাররাও উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আমার ভোট আমি দিব, যাকে খুসি তাকে দিব। সেটা প্রমানিত হলো গত ২৮ নভেম্বর। মানুষ এবার ঘর থেকে বের হয়েছে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে এবং করেছে নির্বাচিত।

দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর ওপর হামলা, বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপরও হামলার ঘটনা ঘটলেও নকলাতে দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। দুই একটি ইউনিয়নে প্রচারে বাধার ঘটনা ঘটলেও বাকীগুলোতে ছিল শান্তিপ্রিয়। সকল প্রার্থীই যার যার মত প্রচার-প্রচারনা চালিয়েছেন। তফসীল ঘোষনা হওয়ার পর থেকেই ছিল উৎসব মুখর পরিবেশ।

শেরপুর জেলা পুলিশের নির্দেশনা মোতাবেক নকলা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুশফিকুর রহমানের নেতৃত্বে থানা পুলিশ উপজেলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন রাখতে পুলিশী মহড়া চালিয়েছেন। এর পাশাপাশি বাহিরের কেউ যেন এ উপজেলায় প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা যেন সৃস্টি না করতে পারে সেজন্য চালিয়েছেন অভিযান। সন্দেহবাজন মোটরসাইকেল করা হয়েছে আটক এবং হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা। বৃদ্ধি করেছেন নজরদারী। থানা পুলিশের ভূমিকা ছিল বিশাল। নির্বাচনের মাঠকে স্বাভাবিক রাখতে দিন রাত কাজ করেছেন তারা। গত ২৮ নভেম্বর প্রমান করেছেন নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা কি?। ভোটাররাও উৎসব মূখর পরিবেশে লাইনে দাড়িয়ে আনন্দের সহিত তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। অসুস্থ্য, গর্ভবতি, বয়স্ক ও পঙ্গু ভোটারও পুলিশের সহযোগিতায় লাইনে না দাড়িয়েও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। জনগনও পুলিশ উপর আস্তা রাখতে পেরেছেন। নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর ভূমিকাও ছিল প্রসংশনীয়। নকলায় রেজিস্ট্রেশন বিহীন কোন যানবাহন (বিশেষ করে মোটসাইকেল) অবাধে প্রবেশ যেন করতে না পারে সেজন্য মাঠে কাজ করেছেন নকলা-নালিতাবাড়ির ট্রাফিক জোন।

সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী মিডিয়া। ইসিকে হতে হবে মিডিয়াবান্ধব এবং সহযোগিতা নিতে হবে তাদের কাছ থেকেও। অতীতে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া উভয়ই নির্বাচন কমিশনকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছিল। এবারও সহযোগিতা করেছে। মিডিয়া ব্যাক্তিরাও অবাধে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পেরেছে। তাদেরকেও সহযোগিতা করেছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। নির্বাচনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরতে মিডিয়ারা অবাধ বিচরণ করতে পেরেছিল।

উপজেলা প্রশাসন এ নির্বাচনকে ঘিরে মাঠে সব সময় কাজ করেছেন। আচরণ বিধি লঙ্গনের দায়ে জরিমানাও করেছিলেন কয়েক প্রার্থী ও সমর্থককে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান উপজেলা পরিষদের সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিয়ে ছিলেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে বদলী হয়ে যান জামালপুর জেলায়। নবাগত হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান নকলায় যোগদান করেন। উপজেলাবাসীর দাবী ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। পূর্ববর্তী ইউএনও’র ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এ নির্বাচনকে সফল করেছেন তিনি। মানুষকে ভোট কেন্দ্র গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে উৎসাহ প্রদান করতেও কাজ করেছেন তিনি। মানুষ যেন কেন্দ্র যেতে কোন ভয় না পায়। সেটা নিশ্চিত করেছেন তিনি। তাই মানুষও ভোট দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মাঠে সবসময় তৎপর ছিলেন সহকারি কমিশনার (ভূমি) কাওছার আহাম্মেদ। কোন প্রার্থী বা তার সমর্থকরা যেন আচরণ বিধি লঙ্গন করতে না পারে সেজন্য সজাগ দৃস্টি রেখেছেন তিনি। সংবাদ পেলেই ছুটে গেছেন ঘটনাস্থলে। পুলিশ বিভাগের সহায়তায় করেছেন জরিমানা।

একটি বলিষ্ঠ, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই যে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে, তেমনটি নয়। কারণ, এর সহযোগী শরিকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য স্বাধীনচেতা ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।

লেখক- সাংবাদিক শফিউল আলম লাভলু, প্রতিনিধি, যায়যায়দিন, নকলা-শেরপুর।