কারাগারের ডাইরী থেকে: মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ

161

জীবনের ফেলে আসা অনেক স্মৃতি আজ চোখের সামনে ভিড় জমিয়েছে। হাসি- কান্না,আনন্দ- বেদনা,দুঃখ- যন্ত্রনায় ভরপুর আমার স্মৃতিময় দিনগুলো। আমার যৌবনের সোনালী দিনগুলো কেটেছে আন্দোলন, সংগ্রাম,বনে- জঙ্গলে,যুদ্ধ আর কারাগারের অভ্যন্তরে। ১৯৭১সালে যুদ্ধ থেকে ফিরে আবার সক্রিয় ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করি। ১৯৭২ সালে নকলা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মোস্তাফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ডাঃ রফিকুল আলম এবং আমি, সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। পরবর্তীতে মরহুম মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়ে বিভাগের ভি,পি, নির্বাচিত হন এবং ডাঃ রফিকুল আলম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব করেন।

১৯৭৪ সালের শেষ দিকে নকলা থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করি। তখন নকলা থানা ছিলো জামালপুর মহুকুমার অধীন। ১৯৭৫ সালের ১৫আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। আমি তখন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ইন্টারমেডিয়েটের ফাইনাল পরীক্ষার্থী। ১৯৭১সালের মতো আবারো বই, খাতা, কলম টেবিলের উপর রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ করতে এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। গারো পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ করেছিলাম। খুনী জিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে ১৯৭৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হয়েছিলাম।

অনেক মানুষের জীবনে অনেক ধরনের স্মৃতি থাকে। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন। যে দিনটি আমার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের এই দিনে শেরপুর সদর উপজেলার চান্দের নগর গ্রামে প্রায় শ’দুই আর্মি, পুলিশ ঘেরাও দিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় আমাকে গ্রেপ্তার করে। দেখতে দেখতে ৪৫ বছর চলে গেলো। জেলে বসে যে ডাইরী লিখেছিলাম তার থেকেই প্রথম কিছু অংশ স্মৃতিচারণ করবো। এই ডাইরী লেখা শুরু করেছিলাম ১৯৮৩ সালের মে মাসের দিকে সিলেট জেলে বসে। জেলের ভিতরে জেল তার নাম সেল। সেই সেলে বসেই শুরু করেছিলাম। যত দিন বেঁচে থাকবো এই দিনটি তত দিন আমার স্মরণে আসবে।

“১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সাল।ষড় ঋতুর এই দেশে তখন শরৎ কাল। শরতের স্নিগ্ধ ভোর।সূর্য তখন উঠি উঠি করছে। সারা রাতের পথ চলায় ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা ঘন্টা খানেক আগে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছি। শেরপুর সদর থানার চান্দের নগর গ্রামের এক দরিদ্র কৃষকের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে আমি তখনো ঘুমে অচেতন। আমার বাম পাশে বিছানো ছেঁড়া কাঁথার নীচে একটা G-3 রাইফেল, একটা S.M.G, একটা 9 M.M. PISTOL, দুইটি তাজা গ্রেনেড,২৫১রাউন্ড গুলি, বেশ কয়েকটি মেগজিন , বাংলার ডাক পত্রিকা। আমার আরো দুই জন সহযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ও কডু পাশের ঘরে। তারা ঘুমিয়ে ছিল কিনা জানিনা। শেরপুর থেকে সেনাবাহিনী এসে সমস্ত গ্রাম ঘেরাও করে রেখেছে।এ সংবাদ পেয়েই মোহাম্মদ আলী আমার ঘরে এসে আমাকে ডাকলো ‘জিন্নাহ ভাই, জিন্নাহ ভাই, আমি ‘উ’ বলতেই সে বললো তাড়াতাড়ি উঠেন আর্মি এসে পড়েছে–এ কথা বলেই তারা দুজন চলে যাচ্ছে নিরাপদ স্হানের উদ্দেশ্যে।আর এ দিকে আমার কানের পর্দা ভেদ করে কথা গুলো ভিতরে গেলেও আমি অচেতন হয়ে পড়ে রইলাম। মিনিট দশেক পরেই আমার ঘরে ঢুকলো বাড়ির মালিক। তার ধারণা ছিল আমি হয়তো চলে গেছি। আমাকে ঘুমে দেখে কৃষকটি হয়তো হতবাক আর সমূহ বিপদের আশংকায় অস্হির হয়ে উঠেছিল। নিরাপদ আওয়াজে আমার গায়ে হাত দিয়ে বললো ‘উঠেন, উঠেন’। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তিনি আবার বললেন ‘আপনি এখনো ঘুমে!আর্মিরা বাড়ি ঘেরাও করেছে’। কথা গুলো বলে লোকটা এক মুহুর্ত দেরি না করে ঘর থেকে চলে গেলো। আমার চোখে তখনো ঘুমের রেশ রয়েছে। আমি হাত দিয়ে চোখ কচলিয়ে কচলিয়ে ঘর হতে বাহির হচ্ছিলাম আর্মিদের অবস্থান দেখতে ও জানতে। ঘরের ভিতর এক পা ঘরের বাহিরে এক পা- এমন অবস্থায় এক জন আর্মি সঙ্গীন উঁচিয়ে গর্জে উঠলো ‘হ্যান্ডস আপ’, ঘুমের রেশ আমার কেটে গেলো। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আবার গর্জে উঠলো ‘হ্যান্ডস-আপ’। তখনো আমি দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করবো। এই সময়ে আরো এক জন আর্মির সিপাই এলো।তারো চাইনিজ রাইফেল আমার দিকে তাক করা। তখন আগের সিপাইটি হয়তো সাহস পেয়ে এক কদম আমার দিকে এগিয়ে এলো। দু’জনের দূরত্ব তখন পাঁচ থেকে ছয় গজ হবে। চাইনিজ রাইফেলের চেম্বারে গুলি উঠিয়ে চিৎকার করে বললো ‘হ্যান্ডস-আপ’। ধীরে ধীরে আমার হাত দুটো উপরে উঠে গেলো। আমি পরাজিত হলাম। আমার বড় বড় চুল আর গলায় ঝুলানো রূপার চেইন সহ অষ্ট ধাতুর বড় একটা তাবিজ দেখে সম্ভবত ওদের সন্দেহটা গাঢ় হয়েছিল। ঐ বাড়িতে আমি ছিলাম বেমানান।

আমার পিঠের সাথে দুটো রাইফেলের বেয়োনেট। ওদের কাছে কোন রশি নেই। আমাকে বাঁধতে হবে তাই তারা একটা কুয়ার (কূপ) কাছে নিয়ে গেলো। পানি উঠানোর জন্য বালতির সাথে বাঁধা একটা রশি ছিলো। রশিটা এক জনে অনেক চেষ্টা করেও গিঁট খুলতে পারছিল না। আমাকে যে ধরে রেখেছিল সে একটা ধমক দিয়ে বললো ‘দাড়া এখানে।দৌড় দিবি তো গুলি করবো। তার পর দু’জনে মিলে বালতি থেকে রশির গিঁট খুলতে শুরু করলো। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।সুযোগ যখন পেলাম সৎ ব্যবহার করতে দেরি করলাম না। দিলাম এক দৌড়। দুই/তিনটা ঘর পার হয়ে একটা ছোট ডোবায় গিয়ে পড়লাম। ডোবায় ছিল হাঁটু পর্যন্ত পানি,ডোবাতে কোন রকম আবর্জনা ছিল না। আমার পিছনে ১৫/২০ গজ দূরে ছিল ধান ক্ষেত, সামনে ছিল প্রচুর কলা গাছ। সিপাই দুই জন হুইসেল বাজিয়ে কলা গাছ গুলোর পাশে এসে দাঁড়াল। ওরা পূর্ব দিকে তাকিয়ে আমাকে ডাকছে ‘শালা আয় তা না হলে গুলি করলাম, আমরা সব দেখতাছি’। আসলে ওরা আমাকে মোটেই দেখতে পাচ্ছে না। বরং ওদের দক্ষিণ দিক থেকে আমিই ওদের দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার চোখ,নাক, পানির উপর ভাসিয়ে ওদের দেখছি আর ভাবছি এখন কি করব।ডুব দিয়ে ধান ক্ষেতে যাওয়ারো কোন উপায় ছিলো না। অথচ ঐ ধান ক্ষেতই ছিল আমার এক মাত্র নিরাপদ স্থান। তখন দেখা যাচ্ছে সূর্যের লাল পিন্ডটা হালকা কুয়াশা ভেদ করে উদিত হচ্ছে। আমি এক পলকে তাকিয়ে আছি ঐ নতুন লাল পিন্ডটার দিকে।অমন করে যেন আর কোন দিন সূর্যের পিন্ডটা দেখিনি। আমি যেন বঙ্গ জননীকে নব রূপে দেখছি।এক মুহুর্তের জন্যে আমার বিপদের কথা ভূলে গেলাম। ভূলে গেলাম আমি শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত। আজ এ সব কথা ভাবলে নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।

সম্বিত যখন ফিরে পেলাম তখন আমার বাম পাশে এক জন আর্মির সিপাই পানির মধ্যে হেটে রাইফেল তাক করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। পিছনে আরো কয়েক জন দেখলাম।লোকানোর কোন উপায় ছিলো না। আমি মাথাটা পানির নীচে রেখে পড়ে রইলাম। এমন সময় সে আমাকে ঝাপ্টে ধরেছে।মাথার চুলে ধরে দুই জনে টেনে পাড়ে উঠালো। প্রথমেই রাইফেলের বাট দিয়ে একটা গুঁতো দিতে যাচ্ছিল তল পেটে; গুঁতোটা লেগে গেল আমার পুরুষাঙ্গের পাশে। আমি ‘ আঃ’বলে চিৎকার দিয়ে বসে পড়লাম। বাঁশের একটা লাঠি দিয়ে পিঠে দুইটা বাড়ি দিলো। সারা বাড়িটা তখন আর্মি আর পুলিশে ভর্তি। বাড়ির চারপাশেও অনেক গুলো সিপাই পজিশনে আছে। সারাটা গ্রাম আর্মি, পুলিশে ঘেরাও দিয়েছে। গ্রামটা শেরপুর টাউন থেকে ৫/৬ মাইল পূর্ব দিকে। (চলবে)

লেখক- বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা আওয়ামী লীগ, নকলা শেরপুর।