আগের তিন সন্তান মেয়ে হওয়ায় পুত্র সন্তানের আশায় স্ত্রীকে চতুর্থ সন্তান নেওয়ার চাপ দিয়েছিলেন স্বামী আরিফুল ইসলাম মনসুর। কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে জানতে পারেন চতুর্থ সন্তানও মেয়ে। এরপর থেকেই স্ত্রীকে রেহানা খাতুনকে চাপ দিতে থাকেন গর্ভপাতের। পরে মনসুর স্ত্রীকে রেহানাকে শেরপুর শহরের বাগবাড়ী এলাকাস্থ মারিয়া নার্সিং হোমে নিয়ে যান গর্ভপাত করাতে। সেখানে কোন চিকিৎসক ছাড়াই ক্লিনিক মালিক ও তার স্ত্রী গর্ভপাত করাতে গেলে মারা যান রেহানা বেগম। স্বজনদের দাবি, গর্ভপাতের নামে রেহানাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরিফুল ইসলাম মনসুরকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেছেন নিহত রেহানার বাবা জয়নাল আবেদীন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ক্লিনিক মালিক বিপ্লব আহমেদ (৫৪) ও তার স্ত্রী নার্স নাজনীন আহমেদকে (৪২) গ্রেফতার করেছে।
জানা গেছে, শেরপুর সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের তিলকান্দি গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীন তার মেয়ে রেহানা আক্তারকে বিয়ে দেন একই গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে আরিফুল ইসলাম মনসুরের সঙ্গে। বিয়ের পর ওই দম্পতির তিন মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। এরপর থেকেই ছেলে সন্তানের জন্য স্ত্রী রেহানা আক্তারের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল স্বামী মনসুর। পরবর্তীতে ছেলে সন্তানের আশায় এই দম্পতি আবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক সময় গর্ভবতী হন রেহেনা। গর্ভধারণের সাড়ে ছয় মাস পর আল্ট্রাসোনোগ্রাম করে মনসুর জানতে পারেন আবারও কন্যা সন্তানের বাবা হতে যাচ্ছেন তিনি। আর এতেই বেঁকে বসেন স্বামী। গর্ভপাত করাতে বাধ্য করেন স্ত্রীকে। তাকে চাপ প্রয়োগ করে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে শহরের মারিয়া নার্সিং হোমে নিয়ে ক্লিনিকের মালিক বিপ্লব আহমেদ তার স্ত্রী নার্স নাজনীন আহমেদ ও আসমানী নামের এক নারী মিলে রেহানার গর্ভপাত করায়। এসময়ই তার মৃত্যু হয়। পরে স্বামী মনসুর দ্রুত রেহানার লাশ বাড়িতে নিয়ে দাফন করার চেষ্টা করে। কিন্তু রেহানার পরিবারের লোকজন টের পেয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
নিহত রেহানার বাবা মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, আমার মেয়েটাকে ছেলে সন্তানের জন্য অনেক নির্যাতন করেছে মনসুর। ছেলে সন্তান না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে সে আমার মেয়েরে হত্যা করেছে। আমি তার কঠিন বিচার চাই। নিহতের ভাই মো. নাজমুল হক বলেন, মনসুর আমার বোনকে অনেক নির্যাতন করেছে। সে আবার বিয়ে করার জন্য আমার বোনকে হত্যা করেছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই। নিহতের আরেক স্বজন বলেন, এটা পরিকল্পিত ডবল মার্ডার। ছয়মাসের গর্ভবতী মহিলাকে গর্ভপাত করাতে চিকিৎসকের প্রয়োজন। চিকিৎসক ছাড়া এমন কাজ করেই এ মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার দাবি করছি।

চিকিৎসক ছাড়া এমন গর্ভপাত ঘটানো বিধিসম্মত নয় বলে জানিয়েছেন শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. খায়রুল কবির সুমন। তিনি জানান, ময়নাতদন্তের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, এ ঘটনায় নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। নিহতের স্বজনদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একইসাথে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
শেরপুরের সিভিল সার্জন ড. অনুপম ভট্টাচার্য্য বলেন, লাইসেন্স না থাকায় ক্লিনিকটি আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরে তারা লাইসেন্স পেয়েছে। আমরা যখন ভিজিটে যাই তখন চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি সবই ঠিক থাকে। পরে যদি কেউ পরিবর্তন করে তাহলে তো আমাদের জানার উপায় নেই। তিনি আরও বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে আমরা গিয়ে ক্লিনিকটি তালাবদ্ধ পেয়েছি। ওই ক্লিনিকের বিষয়ে যদি কেউ অভিযোগ করে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।